ঢাকা ০৫:৪৫ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

কারবালায় পিতা-ভাইয়ের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত

যশোরের শীর্ষ ফুটবলার থেকে ঢাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন

বিশেষ প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০৬:২৮:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬ ১৪৯ বার পড়া হয়েছে

রাজধানীর ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডের’ শীর্ষ সন্ত্রাসী নাইম আহমেদ টিটন -কপোতাক্ষ

রাজধানীর ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডের’ শীর্ষ সন্ত্রাসী নাইম আহমেদ টিটনের দাফন যশোরে সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার রাতে যশোর কারবালা কবরস্থানে পিতা ও বড়ভাইয়ের কবরের পাশে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। মরদেহ প্রথমে খড়কির বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। বড়ভাই রিপন তার লাশ ঢাকা থেকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। কারবালা মসজিদে এশার নামাজের পর জানাজা এবং পরে কারবালা কবরস্থানে পিতা ও বড়ভাইয়ের কবরের পাশে দাফন সম্পন্ন করা হয়।

এর আগে রাত ৮টার দিকে তার মরদেহ ঢাকা থেকে যশোরের খড়কির বাড়িতে আনা হলে বৃদ্ধা মা, দুই ভাইসহ স্বজন ও স্থানীয়দের মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসে। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাতে ঢাকার নিউমার্কেট এলাকার পাশে প্রকাশ্যে গুলিতে নিহত হন টিটন। ঘটনাটি ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে, যেখানে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা খুব কাছ থেকে তাকে এলোপাতাড়ি গুলি করে হত্যা করে।

টিটনের পৈত্রিক বাড়ি যশোর শহরের খড়কি এলাকায়, স্থানীয়ভাবে ‘আপন মোড়’ নামে পরিচিত স্থানে। টিটনের বাবা ফখরুদ্দিন খুলনার একটি জুটমিলের কর্মকর্তা ছিলেন। পরিবারে দুই মা, সাত ভাই ও পাঁচ বোন। টিটন অবিবাহিত এবং দীর্ঘদিন আন্ডারওয়ার্ল্ডে সক্রিয় ছিলেন।

এদিকে, নিহতের বড়ভাই সাঈদ আক্তার সুনির্দিষ্ট করে কাউকে আসামি না করলেও এজাহারে সন্দেহভাজন হিসেবে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, বাদল ওরফে কিলার বাদল, শাহজাহান, রনি ওরফে ড্যাগারি রনির নাম উল্লেখ করেছেন। তাদের সঙ্গে বছিলায় কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়ে টিটনের বিরোধ চলছিল বলে বাদী জানিয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ১৯৮৬-৮৭ সালের দিকে যশোরের ‘ওস্তাদখ্যাত’ কোচ ইমদাদুল হক সাচ্চুর তত্ত্বাবধানে জেলায় যে কয়েকজন ফুটবলার প্রতিনিধিত্ব করতেন টিটন তাদের একজন। আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়ের নৈপুণ্যতা দেখিয়ে তিনি জনপ্রিয় ফুটবলার হয়ে ওঠেন। ঢাকা, খুলনা ও চুয়াডাঙ্গা জেলার বিভিন্ন দলের হয়ে খেলেছেন। খেলোয়াড় জীবনের জনপ্রিয়তার মধ্যেই জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। আবার সাংগঠনিক কোনো দায়িত্বে না থাকলেও বিএনপির স্থানীয় কর্মী ছিলেন টিটন।

খড়কির বাড়িতে টিটনকে শেষ দেখা দেখতে এলাকাবাসীর ভীড় -কপোতাক্ষ

১৯৯৮ সালের দিকে যশোরের পানি উন্নয়ন বোর্ডের সামনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রতিপক্ষরা তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। কয়েকমাস জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকার পরে সুস্থ হয়ে জড়িয়ে পড়েন অপরাধজগতে। ১৯৯৯ সালে যশোরের কারবালায় জোড়া খুনের পর যশোর ছেড়ে ঢাকায় চলে যান। পরে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে অপরাধজগতে নিজের পরিচিতি বাড়াতে থাকেন। তিনি একাধিক হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্বও দেন। অস্ত্র-সোনাচালান ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। তার নেতৃত্বে অস্ত্রের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা ছিল, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্যবসায়ী বাবর এলাহী হত্যা।

২০০০ সালে র‌্যাবের কথিত ক্রসফায়ারে নিহত হন তার ভাই টুটুল। এরপর টিটন ঢাকায় অবস্থান নিয়ে এককভাবে তার অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করতে থাকেন। যদিও তিনি গোপনে কাজ করতেন, তবুও একাধিকবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, টিটন যশোর-ঢাকা রুটে একটি শক্তিশালী অস্ত্র চোরাচালান সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে অস্ত্র এনে যশোর হয়ে ঢাকায় সরবরাহ করা হতো। পরে সেগুলো দেশের বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো।

২০০৪ সালে টিটনকে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তিনি ২০১৪ সালে বাবর এলাহী হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন। ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট জামিনে মুক্তির পর তিনি আত্মগোপনে ছিলেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার ২০০১ সালের ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করে, যেখানে টিটনের নাম ছিল ২ নম্বরে। সেই সময় সরকারের পক্ষ থেকে এই শীর্ষ ২৩ সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করে দেশজুড়ে পোস্টার লাগানো হয়। টিটনের ভগ্নিপতি ছিলেন ঢাকার আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজেদুল ইসলাম ইমন, যার ছত্রছায়ায় টিটন ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। টিটন মোহাম্মদপুরের সন্ত্রাসীচক্র হারিছ-জোসেফ গ্রুপে যুক্ত ছিলেন। টিটনের তৎপরতা ছিল ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ এলাকায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।

শোকাতুর বৃদ্ধা মা, ভাইসহ স্বজনেরা -কপোতাক্ষ

বুধবার রাতে টিটনের মরদেহ খড়কির আপনমোড়ে পৌঁছালে প্রতিবেশী ও খেলোয়াড়রা তার বাড়িতে ছুটে আসেন। তাদেরই একজন যশোরের সাবেক খেলোয়াড় ও রেফারি লাবু জোয়ার্দার ইত্তেফাককে জানান, টিটন আমার বন্ধু। তার বাবা দুই বিয়ে করেন। দুই মায়ের ১২ সন্তানের মধ্যে টিটন প্রথম মায়ের সন্তান। ৯০ দশকের দিকে টিটন ও তার বড়ভাই রিপন দুজনই যশোরের সেরা ফুটবলার ছিলেন। সাচ্চু ওস্তাদের নেতৃত্বে আমরা যারা ৯০ দশকে এই অঞ্চলে ফুটবলের নেতৃত্ব দিতাম; তাদের একজন টিটন। দুঃখজনক ঘটনা হলো নামকরা ফুটবলার থেকে সে অন্ধকার জগতে প্রবেশ করে। তার এই জগতে প্রবেশও ট্রাজেডি রয়েছে। তার উপর রাজনৈতিক হামলা হওয়াতে প্রতিশোধ পরায়ন হয়েই সে ঐ জগতে পা বাড়ায়। ৯৯ সালের দিকে ঢাকায় গিয়ে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে সে আর যশোরে আসতো না।

তিনি আরও জানান, টিটন অত্যন্ত স্টাইলিশ ছিল। খেলত রাইট উইং ও লেফট উইং-এ। চুয়াডাঙ্গায় একবার ফুটবল খেলতে যাওয়ার পথে যশোর শহরের চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে পুলিশ তাকে আটক করে। এলাকাভিত্তিক ছোটখাট বিরোধে এমন আটকের ঘটনায় সে ক্ষুদ্ধ হয়ে অপরাধ জগতে পা রাখে বলে আমার ধারণা।

দাফনের জন্য টিটনের লাশ নেয়া হচ্ছে কারবালায় -কপোতাক্ষ

স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন যশোরে না থাকায় এই প্রজন্মের অনেকেই টিটনকে চিনেন না। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিন থেকে চারবার যশোরের বাড়িতে আসেন। যদিও তিনি অবিবাহিত। বাড়িতে এসেও কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতেন না। পরিবারের স্বজনরা টিটনের বিষয়ে গণমাধ্যমের কাছে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মো. মাসুম খান ইত্তেফাককে বলেন, যশোরে সে খুব ভালো স্পোর্টসম্যান ছিল বলে জেনেছি। এখানে তার কোনো খারাপ রেকর্ড নেই। তার দুলাভাই ঢাকার আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজেদুল ইসলাম ইমনের হাত ধরে তার অপরাধজগতে প্রবেশ। সে ২৪ বছর জেলে ছিল বলে জানি।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপলোডকারীর তথ্য

কারবালায় পিতা-ভাইয়ের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত

যশোরের শীর্ষ ফুটবলার থেকে ঢাকায় শীর্ষ সন্ত্রাসী টিটন

আপডেট সময় : ০৬:২৮:২৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

রাজধানীর ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডের’ শীর্ষ সন্ত্রাসী নাইম আহমেদ টিটনের দাফন যশোরে সম্পন্ন হয়েছে। বুধবার রাতে যশোর কারবালা কবরস্থানে পিতা ও বড়ভাইয়ের কবরের পাশে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়। মরদেহ প্রথমে খড়কির বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। বড়ভাই রিপন তার লাশ ঢাকা থেকে বাড়িতে নিয়ে আসেন। কারবালা মসজিদে এশার নামাজের পর জানাজা এবং পরে কারবালা কবরস্থানে পিতা ও বড়ভাইয়ের কবরের পাশে দাফন সম্পন্ন করা হয়।

এর আগে রাত ৮টার দিকে তার মরদেহ ঢাকা থেকে যশোরের খড়কির বাড়িতে আনা হলে বৃদ্ধা মা, দুই ভাইসহ স্বজন ও স্থানীয়দের মাঝে শোকের ছায়া নেমে আসে। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) রাতে ঢাকার নিউমার্কেট এলাকার পাশে প্রকাশ্যে গুলিতে নিহত হন টিটন। ঘটনাটি ঘটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহনেওয়াজ ছাত্রাবাসের সামনে, যেখানে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা খুব কাছ থেকে তাকে এলোপাতাড়ি গুলি করে হত্যা করে।

টিটনের পৈত্রিক বাড়ি যশোর শহরের খড়কি এলাকায়, স্থানীয়ভাবে ‘আপন মোড়’ নামে পরিচিত স্থানে। টিটনের বাবা ফখরুদ্দিন খুলনার একটি জুটমিলের কর্মকর্তা ছিলেন। পরিবারে দুই মা, সাত ভাই ও পাঁচ বোন। টিটন অবিবাহিত এবং দীর্ঘদিন আন্ডারওয়ার্ল্ডে সক্রিয় ছিলেন।

এদিকে, নিহতের বড়ভাই সাঈদ আক্তার সুনির্দিষ্ট করে কাউকে আসামি না করলেও এজাহারে সন্দেহভাজন হিসেবে শীর্ষ সন্ত্রাসী ইমামুল হাসান হেলাল ওরফে পিচ্চি হেলাল, বাদল ওরফে কিলার বাদল, শাহজাহান, রনি ওরফে ড্যাগারি রনির নাম উল্লেখ করেছেন। তাদের সঙ্গে বছিলায় কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নিয়ে টিটনের বিরোধ চলছিল বলে বাদী জানিয়েছেন।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ১৯৮৬-৮৭ সালের দিকে যশোরের ‘ওস্তাদখ্যাত’ কোচ ইমদাদুল হক সাচ্চুর তত্ত্বাবধানে জেলায় যে কয়েকজন ফুটবলার প্রতিনিধিত্ব করতেন টিটন তাদের একজন। আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়ের নৈপুণ্যতা দেখিয়ে তিনি জনপ্রিয় ফুটবলার হয়ে ওঠেন। ঢাকা, খুলনা ও চুয়াডাঙ্গা জেলার বিভিন্ন দলের হয়ে খেলেছেন। খেলোয়াড় জীবনের জনপ্রিয়তার মধ্যেই জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। আবার সাংগঠনিক কোনো দায়িত্বে না থাকলেও বিএনপির স্থানীয় কর্মী ছিলেন টিটন।

খড়কির বাড়িতে টিটনকে শেষ দেখা দেখতে এলাকাবাসীর ভীড় -কপোতাক্ষ

১৯৯৮ সালের দিকে যশোরের পানি উন্নয়ন বোর্ডের সামনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলে প্রতিপক্ষরা তাকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে জখম করে। কয়েকমাস জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকার পরে সুস্থ হয়ে জড়িয়ে পড়েন অপরাধজগতে। ১৯৯৯ সালে যশোরের কারবালায় জোড়া খুনের পর যশোর ছেড়ে ঢাকায় চলে যান। পরে ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠেন। ধীরে ধীরে অপরাধজগতে নিজের পরিচিতি বাড়াতে থাকেন। তিনি একাধিক হত্যাকাণ্ডে নেতৃত্বও দেন। অস্ত্র-সোনাচালান ব্যবসার সঙ্গেও জড়িত ছিলেন। তার নেতৃত্বে অস্ত্রের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে ওঠে। তার বিরুদ্ধে একাধিক হত্যা মামলা ছিল, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্যবসায়ী বাবর এলাহী হত্যা।

২০০০ সালে র‌্যাবের কথিত ক্রসফায়ারে নিহত হন তার ভাই টুটুল। এরপর টিটন ঢাকায় অবস্থান নিয়ে এককভাবে তার অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালনা করতে থাকেন। যদিও তিনি গোপনে কাজ করতেন, তবুও একাধিকবার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে আটক হন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, টিটন যশোর-ঢাকা রুটে একটি শক্তিশালী অস্ত্র চোরাচালান সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছিলেন। ভারতীয় সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে অস্ত্র এনে যশোর হয়ে ঢাকায় সরবরাহ করা হতো। পরে সেগুলো দেশের বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দেওয়া হতো।

২০০৪ সালে টিটনকে ঢাকার ক্যান্টনমেন্ট এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করেছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তিনি ২০১৪ সালে বাবর এলাহী হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত হন। ২০২৪ সালের ১২ আগস্ট জামিনে মুক্তির পর তিনি আত্মগোপনে ছিলেন বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে।

সূত্র জানায়, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার ২০০১ সালের ২৩ জন শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকা প্রকাশ করে, যেখানে টিটনের নাম ছিল ২ নম্বরে। সেই সময় সরকারের পক্ষ থেকে এই শীর্ষ ২৩ সন্ত্রাসীকে ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করে দেশজুড়ে পোস্টার লাগানো হয়। টিটনের ভগ্নিপতি ছিলেন ঢাকার আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজেদুল ইসলাম ইমন, যার ছত্রছায়ায় টিটন ঢাকার আন্ডারওয়ার্ল্ডে শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। টিটন মোহাম্মদপুরের সন্ত্রাসীচক্র হারিছ-জোসেফ গ্রুপে যুক্ত ছিলেন। টিটনের তৎপরতা ছিল ধানমন্ডি ও হাজারীবাগ এলাকায়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আবারও সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি।

শোকাতুর বৃদ্ধা মা, ভাইসহ স্বজনেরা -কপোতাক্ষ

বুধবার রাতে টিটনের মরদেহ খড়কির আপনমোড়ে পৌঁছালে প্রতিবেশী ও খেলোয়াড়রা তার বাড়িতে ছুটে আসেন। তাদেরই একজন যশোরের সাবেক খেলোয়াড় ও রেফারি লাবু জোয়ার্দার ইত্তেফাককে জানান, টিটন আমার বন্ধু। তার বাবা দুই বিয়ে করেন। দুই মায়ের ১২ সন্তানের মধ্যে টিটন প্রথম মায়ের সন্তান। ৯০ দশকের দিকে টিটন ও তার বড়ভাই রিপন দুজনই যশোরের সেরা ফুটবলার ছিলেন। সাচ্চু ওস্তাদের নেতৃত্বে আমরা যারা ৯০ দশকে এই অঞ্চলে ফুটবলের নেতৃত্ব দিতাম; তাদের একজন টিটন। দুঃখজনক ঘটনা হলো নামকরা ফুটবলার থেকে সে অন্ধকার জগতে প্রবেশ করে। তার এই জগতে প্রবেশও ট্রাজেডি রয়েছে। তার উপর রাজনৈতিক হামলা হওয়াতে প্রতিশোধ পরায়ন হয়েই সে ঐ জগতে পা বাড়ায়। ৯৯ সালের দিকে ঢাকায় গিয়ে সন্ত্রাসীদের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লে সে আর যশোরে আসতো না।

তিনি আরও জানান, টিটন অত্যন্ত স্টাইলিশ ছিল। খেলত রাইট উইং ও লেফট উইং-এ। চুয়াডাঙ্গায় একবার ফুটবল খেলতে যাওয়ার পথে যশোর শহরের চুয়াডাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড থেকে পুলিশ তাকে আটক করে। এলাকাভিত্তিক ছোটখাট বিরোধে এমন আটকের ঘটনায় সে ক্ষুদ্ধ হয়ে অপরাধ জগতে পা রাখে বলে আমার ধারণা।

দাফনের জন্য টিটনের লাশ নেয়া হচ্ছে কারবালায় -কপোতাক্ষ

স্থানীয়রা জানান, দীর্ঘদিন যশোরে না থাকায় এই প্রজন্মের অনেকেই টিটনকে চিনেন না। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিন থেকে চারবার যশোরের বাড়িতে আসেন। যদিও তিনি অবিবাহিত। বাড়িতে এসেও কারও সঙ্গে যোগাযোগ করতেন না। পরিবারের স্বজনরা টিটনের বিষয়ে গণমাধ্যমের কাছে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

যশোর কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মো. মাসুম খান ইত্তেফাককে বলেন, যশোরে সে খুব ভালো স্পোর্টসম্যান ছিল বলে জেনেছি। এখানে তার কোনো খারাপ রেকর্ড নেই। তার দুলাভাই ঢাকার আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সাজেদুল ইসলাম ইমনের হাত ধরে তার অপরাধজগতে প্রবেশ। সে ২৪ বছর জেলে ছিল বলে জানি।