ব্যবসায়ীকে বালুতে পুঁতে ৪ কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ
বহুল আলোচিত সাবেক বিএনপি নেতা জনি আটক
- আপডেট সময় : ০৯:০১:০৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৪ অগাস্ট ২০২৫ ৩০৮ বার পড়া হয়েছে
বহুল আলোচিত যশোরের নওয়াপাড়ায় ‘ব্যবসায়ীকে বালুতে পুঁতে ৪ কোটি টাকা আদায়ের’ অভিযোগে দায়ের করা মামলায় আলোচিত বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান জনিকে খুলনা থেকে আটক করেছে ডিবি পুলিশ।
আজ (বৃহস্পতিবার) খুলনা শহরের রোজ গার্ডেন হোটেল থেকে স্থানীয় পুলিশের সহযোগিতায় তাকে আটক করা হয়। আটকের পর জনিকে নওয়াপাড়াতে তার ইকোপার্কসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়েছে যৌথবাহিনী। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন অভয়নগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল আলীম।
জনি নওয়াপাড়া পৌর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ছিলেন। রাজনীতিক পটপরিবর্তনের পর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ ও চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগের ভিত্তিতে দল তার পদ স্থগিত করেছে।
অভয়নগর থানার ওসি আব্দুল আলিম বলেন, দীর্ঘদিন পলাতক থাকার পর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে যৌথবাহিনীর একটি দল বৃহস্পতিার ভোরে খুলনায় অভিযান চালিয়ে জনিকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। বর্তমানে জনি পুলিশি হেফাজতে রয়েছেন। তার বিরুদ্ধে আরও কিছু মাদক ও চাঁদাবাজির অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তিনি বলেন, ৪ কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগে জনির বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল। সেই মামলার ভিত্তিতেই যৌথবাহিনীর অভিযানে তাকে গ্রেপ্তার করেছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে এবং আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাকিদের আটকেও অভিযান চলছে।
এ সময় আসাদুজ্জামানের সহযোগী তুহিন শেখ (৩৫) নামের একজনকে আটক করা হয়। তুহিন শেখ অভয়নগর উপজেলার চলিশিয়া ইউনিয়ন পরিষদের ৫ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য ও বিএনপি কর্মী। তিনি উপজেলার কোটা গ্রামের মাহমুদ শেখের ছেলে।
যৌথবাহিনী ওই দুজনকে নিয়ে আসাদুজ্জামানের কনা ইকো পার্ক, গুড়হাটা এলাকার বাড়ি ও ব্যক্তিগত কার্যালয়ে অভিযান চালাচ্ছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবুল বাশার বলেন, জনির ইকো পার্ক ও ব্যক্তিগত অফিসে চর্চার সেল (নির্যাতনের বিশেষ জায়গা) আছে, এমন অভিযোগের ভিত্তিতে যৌথবাহিনী তাকে সঙ্গে নিয়ে অভিযান চালাচ্ছে।
অভয়নগর থানা সূত্র জানায়, গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর অভয়নগরে নওয়াপাড়ার জাফ্রিদী এন্টারপ্রাইজের কর্ণধার শাহনেওয়াজ কবীর টিপুকে জনির কনা ইকো পার্কে বালুতে পুঁতে ও অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে কয়েক দফায় চার কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ করেন ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীর স্ত্রী আসমা খাতুন। ঐ ঘটনার ১১ মাস পর আসমা খাতুন চলতি বছরের ২ আগস্ট আসাদুজ্জামান জনিসহ ছয়জনের নামে অভয়নগর থানায় মামলা করেন। একই অভিযোগ স্থানীয় সেনাক্যাম্পেও দেন ভুক্তভোগী নারী। মামলার পর এজাহারভুক্ত আসামি ডিশ ব্যবসায়ী মিঠু ও বিএনপি নেতা জনির বাবা কামরুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
সর্বশেষ বৃহস্পতিবার সকালে জনিকে আটক করেছে পুলিশ। পলাতক রয়েছেন অভিযুক্ত তিন আসামি পৌর বিএনপির ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সাংগঠনিক সম্পাদক সম্রাট হোসেন, নওয়াপাড়া প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মফিজুর রহমান দপ্তরী ও গরু হাটখোলার সৈকত হোসেন হিরা।
অভয়নগর থানার ওসি মো. আব্দুল আলীম সাংবাদিকদের বলেন, ‘চাঁদাবাজির মামলায় দীর্ঘদিন পালিয়ে থাকা আসাদুজ্জামান জনিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে যৌথবাহিনীর একটি দল খুলনা থেকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়। তাকে অভয়নগর থানায় রাখা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আরও কিছু চাঁদাবাজি ও মাদকের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাকিদের আটকে অভিযান চলছে।
আসমা খাতুন জানান, গত বছরের ২ সেপ্টেম্বর কৌশলে সৈকত হোসেন হিরার মাধ্যমে তার স্বামী টিপুকে নিজের অফিসে ডেকে নেন বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান জনি। সেখানে তাকে মারধর ও অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে দুই কোটি টাকা দাবি করেন জনি। সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার অ্যান্ড কমার্স ব্যাংক থেকে জনির নিজ প্রতিষ্ঠানের হিসাবে দুই কোটি টাকা আরটিজিএস করে পাঠান আসমা খাতুন। টাকা পেয়ে টিপুকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এরপর ১৮ সেপ্টেম্বর সকালে গ্রামের বাড়ি চলিশিয়া থেকে মোটরসাইকেলে বাজারে যাওয়ার পথে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ফটকের পর টিপুর গতিরোধ করেন হিরা। জনি নিজের কেনা ইকো পার্কে টিপুকে নিয়ে গেছেন বলে জানানো হয়।
আসমা খাতুনের অভিযোগ, গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর সকাল আনুমানিক ৯টার দিকে ব্যবসায়ী টিপু গ্রামের বাড়ি চলিশিয়া থেকে মোটরসাইকেলযোগে বাজারে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গেট পার হলে সৈকত হোসেন হিরা তার গতিরোধ করেন। এরপর বেলা ৩টা পর্যন্ত টিপুর মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়। পরে জানতে পারেন টিপুকে বিএনপি নেতা আসাদুজ্জামান জনির ‘কনা ইকো পার্কে’ নিয়ে যাওয়া হয়েছে। টিপুকে উদ্ধারে তার স্ত্রী সেখানে গেলে আসাদুজ্জামান জনি, সম্রাট হোসেন ও নওয়াপাড়া প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মফিজ উদ্দিন আগ্নেয়াস্ত্র ঠেকিয়ে বাদীকে মারধর করে। এরপর টিপুকে বুক পর্যন্ত গর্ত খুঁড়ে বালু চাপা দিয়ে ভয়ভীতি দেখায় এবং আরও ২ কোটি টাকা দাবি করে। এ অবস্থায় ব্যবসায়ী টিপু বাধ্য হয়ে তার ম্যানেজারকে ফোন করে টাকা দিতে বলেন।
এরপর ম্যানেজার সাংবাদিক মফিজের একাউন্টে পূবালী ব্যাংক থেকে ৬৮ লাখ ও সাউথ বাংলা ব্যাংক থেকে ৩২ লাখ টাকা রিয়েল টাইম গ্রস সেটেলমেন্ট (আরটিজিএস) করে। এসময় মফিজ আরও ১ কোটি টাকার চেক আদায় করে। পাশাপাশি জনির নামে ক্রয় করা ৩টি ও দিলিপ সাহার নামে ক্রয় করা ৩টি ১০০ টাকার ফাঁকা স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর করিয়ে নেয়। কাউকে কিছু না জানানো ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়।



















