নদীর দুই অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় বিল হরিণায় জলাবদ্ধতা
মুক্তেশ্বরী নদী ভরাট করে প্লট বিক্রির সাইনবোর্ড!
- আপডেট সময় : ০২:৫০:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৯ অগাস্ট ২০২৫ ২৭৮ বার পড়া হয়েছে
চাঁচড়া ইউনিয়নের ভাতুড়িয়ার এই কালভার্টের দক্ষিণপাশে নদী আছে, উত্তরপাশে পুরোটা ভরাট করে প্লট বিক্রির সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে -কপোতাক্ষ
যশোরে নদীর একটি অংশের পুরোটাই ভরাট করে প্লট বিক্রির সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে! অভাবনীয় এই ঘটনাটি ঘটেছে যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নে মুক্তেশ্বরী নদীতে। চাঁচড়া দক্ষিণপাড়া ও ভাতুড়িয়া পূর্বপাড়ার মাঝের মুক্তেশ্বরী নদীর সম্পূর্ণ অংশ ভরাট করে প্রায় দশ বিঘা জমি দখল করে নিয়েছে প্রভাবশালীরা। অভিযোগ উঠেছে, জাল-জালিয়াতি করে নদীর জমি ব্যক্তি মালিকানায় রেকর্ড করে এখন তা প্লট আকারে বিক্রির চেষ্টা চলছে। আর নদী ভরাট করে দুই অংশকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলায় বিল হরিণায় বেড়েছে জলাবদ্ধতা। বিল ছাপিয়ে পানি ঢুকে পড়েছে লোকালয়ে-বাড়িঘরে। এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।
যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের ভাতুড়িয়া বাজার থেকে পূর্বদিকের সড়কটি চাঁচড়া দক্ষিণপাড়ার দিকে চলে গেছে। এই সড়কের কিছুদূর গেলেই দেখা মিলবে একটি কালভার্টের। কালভার্টটির দক্ষিণপাশে থৈ থৈ জলরাশি। আর উত্তরপাশে পুরোটা ভরাট করে প্লট বিক্রির সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে। নদী ভরাট করে এখানে দখল করা হয়েছে প্রায় দশ বিঘা জমি। এই জমির উত্তরপাশে নদী বহমান রয়েছে, সেখানে বাঁধ দিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই বাঁধের উপরে নদীর সাথে সংযুক্ত রয়েছে জিয়া’র খাল। মূলত এই জিয়ার খাল দিয়ে নদীর পানি প্রবাহিত হওয়ার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দখল করে নেওয়া হয়েছে মুক্তেশ্বরী নদী; এমনটাই বক্তব্য স্থানীয়দের।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মুক্তেশ্বরী নদীটি যশোরের চৌগাছা উপজেলা থেকে এসে সদর উপজেলা হয়ে বিল হরিণায় গিয়ে শেষ হয়েছে। সর্পিলাকার এই নদী দিয়ে বর্ষাকালে যশোর সদর উপজেলা ও শহরের একাংশের পানি দক্ষিণমুখি হয়ে বিল হরিণায় গিয়ে পতিত হয়। ৮০-র দশকে সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের পরিকল্পনায় মুক্তেশ্বরী নদীর সাথে একটি খাল খনন করা হয়। যশোর সদর উপজেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের চাঁচড়া দক্ষিণপাড়া থেকে এই খালটি খনন করে পূর্বদিকে সতীঘাটা হয়ে ঢাকুরিয়ার দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এটি ‘জিয়ার খাল’ নামে পরিচিত। আর এখান থেকে মুক্তেশ্বরী নদীটি আরও কয়েক কিলোমিটার দক্ষিণে গিয়ে বিল হারিণায় একাধিক খালে বিভক্ত হয়ে মিশে গেছে।
স্থানীয়রা জানান, এই খাল কাটার পর থেকে মুক্তেশ্বরীর নিচের অংশ ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করতে শুরু করে প্রভাবশালীরা। কখনও ইজারা, কখনও দখলদারিত্বের মাধ্যমে মাছ চাষ হলেও পানি প্রবাহ বিদ্যমান ছিল। কিন্তু কয়েকমাস আগে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র ভাতুড়িয়া নারায়নপুর সড়কের কালভার্টের উত্তরপাশ থেকে জিয়ার খালের সংযুক্তমুখ পর্যন্ত মাটি ফেলে ভরাট করতে শুরু করে। পুরো এই অংশটি ভরাট করে এখন সেখানে প্লট বিক্রির সাইনবোর্ড টাঙিয়ে দেওয়া হয়েছে।
চাঁচড়া দক্ষিণপাড়ার বাসিন্দা মোবারেক হোসেন বলেন, রাস্তায় কালভার্ট আছে। কালভার্টের একপাশে নদী আছে; আরেক পাশে নেই। অন্ধ লোকও দেখলে বলবে এখানে নদী ছিল। কিন্তু এখন তা ব্যক্তি মালিকানার জমি বলে দাবি করা হচ্ছে।
ভাতুড়িয়া পূর্বপাড়ার বয়োবৃদ্ধ তবিবর রহমান বলেন, এই নদীতে পাট জাঁক দিয়েছি, গরু-ছাগলের গোছল করিয়েছি। নদীর পানি দিয়ে চাষ-বাস করেছি। এখন সেই নদী ভরাট করে প্লট বিক্রি করা হচ্ছে।
ভাতুড়িয়া নারায়নপুর গ্রামের বাসিন্দা ফিরোজ আহমেদ জানান, ‘অনেক স্থানে নদীর পাড় দখল করে স্থাপনা নির্মাণ বা নদী দখল করে মাছ চাষের অভিযোগ পাওয়া যায়। কিন্তু এখানে পুরো নদীটাই দখল করে ভরাট করে নেওয়া হয়েছে। তারা দাবি করছে, এই জমির মালিক তারা। কিন্তু নদীর জমি কিভাবে ব্যক্তিমালিকানা হয়; তা আমাদের বুঝে আসে না।’
ভাতুড়িয়া পূর্বপাড়ার বাসিন্দা বৃদ্ধ কাশেম মোড়ল জানান, আগে বর্ষার সময় উজানের পানি, যশোর শহরের পানি মুক্তেশ্বরী দিয়ে বিল হরিণায় এসে পড়তো। জিয়ার খাল কাটার পর সেই পানি দুই ভাগ হয়ে নদী ও খাল দিয়ে নিস্কাশিত হতো। উপরের পানির চাপ কমে গেলে বিলের পানি মুক্তেশ্বরী দিয়ে উঠে এসে জিয়ার খাল দিয়ে নেমে যেত। এখন মুক্তেশ্বরী মাঝ বরাবর দখল হয়ে যাওয়া উপরের পানি শুধু জিয়ার খাল দিয়েই নেমে যাচ্ছে। কিন্তু বিলের পানি আর ওই খালে যেতে পারছে না। ফলে বিলের পানি এবং মণিরামপুরের উত্তরাংশের পানিতে হরিণার বিল এখন টইটুম্বুর। এই জলাবদ্ধতায় হাজার হাজার বিঘা জমিতে এবার আর আমন ধান চাষ সম্ভব হবে না।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন নদীর এই অংশ ইজারা নিয়ে মাছ চাষ করা চক্রটি গোপনে গোপনে অবৈধভাবে এই জমির শ্রেণি পরিবর্তন করেছে। এরপর জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে তা নিজেদের নামে করে নিয়েছে। আর এখন সেই জমি বিক্রির চেষ্টা চলছে।
ভাতুড়িয়া এলাকার মাসুদ রানা বলেন, ‘ম্যাপের এই অংশেও মুক্তেশ্বরী নদী বিদ্যমান রয়েছে। অথচ তা ভরাট করে বিক্রির চেষ্টা চলছে। আর নদী ভরাটের খেসারত দিতে হচ্ছে আমাদের। বিলের হাজার হাজার একর জমি জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে আছে। বিল ছাপিয়ে পানি বাড়িঘরে প্রবেশ করছে। আমরা অবিলম্বে এই অবৈধ দখল উচ্ছেদ করে নদীর জায়গা নদীকে ফেরত দেওয়ার দাবি জানাই।’
এদিকে, জমি বিক্রির সাইনবোর্ডে যে ফোন নাম্বার দেওয়া রয়েছে, সেটি যশোর রেজিস্ট্রি অফিসের এক সময়ের পিয়ন নূর ইসলাম নুরুর। ওই ফোন নাম্বারে যোগাযোগ করা হলে নূর ইসলাম নুরু দাবি করেন, ‘ওই জমি ব্যক্তিমালিকানার। জমির মালিক ওই এলাকার জামাল, কামাল, মুন্না। তাদের নামে দলিল আছে, নামপত্তন আছে। তাই তাদের পক্ষে তিনি জমি বিক্রি করছেন।’
তবে তিনি জমির মালিক হিসেবে যাদের নাম উল্লেখ করেন, তাদের ফোন নাম্বার দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বলেন, ‘ওই জমির সব কাগজপত্র আমাদের রয়েছে। ক্রেতাদের বৈধভাবে জমি রেজিস্ট্রি করে দেওয়া হবে।’
এ ব্যাপারে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী পলাশ কুমার ব্যানার্জী বলেন, নদীর জমি কোনোভাবেই ব্যক্তি মালিকানায় যাওয়ার সুযোগ নেই। নদী ভরাট ও দখলের বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে যথাযথ আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।


















