শ্রেণি পরিবর্তন করে হচ্ছে আবাসন প্রকল্প
যশোরে পুকুর ভরাট করে বহুতল ভবন
- আপডেট সময় : ০২:১৬:২১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ২৪ জুন ২০২৫ ৩৫৩ বার পড়া হয়েছে
যশোর শহরের ঐতিহ্যবাহী প্রায় সব পুকুর তার অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলতে চলেছে। একের পর এক পুকুর-দীঘি ভরাট করে ফেলা হচ্ছে। গত কয়েক দশকে শুধুমাত্র যশোর শহর ও শহরতলীতে ভরাট হয়ে গেছে একশ’র বেশি পুকুর-দীঘি। আর যশোর পৌরসভার মধ্যে একডজন পুকুরের উপর শোভা পাচ্ছে অনেক বহুতল ভবন। অভিযোগ রয়েছে, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন উপেক্ষা করে একের পর এক পুকুর ভরাট করা হচ্ছে।
আবাসন প্রকল্প করা হচ্ছে বিলের জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে। তবে পরিবেশ অধিদপ্তর সম্প্রতি পুকুর ভরাটের বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘন করে পুকুর ভরাটের অভিযোগে মামলা করা হয়েছে আদালতে।
পরিবেশবাদী সংস্থা জনউদ্যোগের তথ্যানুযায়ী, যশোর পৌর এলাকায় পৌরসভার নামীয়, জেলা প্রশাসকের নামীয় ও বেসরকারি মিলে ৩২০টি জলাশয় রয়েছে। এর মধ্যে পৌরসভার ৬টি, জেলা প্রশাসকের ৪০টি এবং বেসরকারি ২৭৪টি পুকুর রয়েছে। ১০-১২ বছর আগে পুকুরের সংখ্যা আরও বেশি ছিল।
জনউদ্যোগ যশোরের আহ্বায়ক প্রকৌশলী নাজির আহমদ বলেন, গত এক থেকে দেড়যুগে প্রধান ডাকঘরের সামনের পুকুর, রেলগেট চোরমারা দীঘি, নিরালা সিনেমা হলের পাশের পুকুর, বেজপাড়ার শ্রীধর পুকুর, আরবপুরের বড় পুকুর, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন সড়কের ইসমাইল ডাক্তারের বাড়ির পেছনের বড় দীঘি, ইসলামিয়া স্কুলের পুকুর, পুরাতন কসবা আবু তালেব সড়কের পুকুর, ডাক্তার মোজাম্মেল হোসেনের পুকুর, মন্টুদের পুকুর, নিরিবিলি পুকুর, রাজুদের পুকুর, মুন্সীবাড়ি পুকুর, আয়নাল খাঁর পুকুর, জব্বার বিহারীর পুকুর, গোহাটা পুকুর, রাজবাড়ী বিদ্যুৎ অফিসের সামনের পুকুর, ষষ্ঠিতলাপাড়ায় ফায়ার সার্ভিস অফিসের সামনের পুকুর, খালধার সড়কের পুকুর, এসপি অফিসের পুকুর, পুলিশ লাইনের পুকুর ভরাট করা হয়েছে। শহরের ভেতরে থাকা আরও কিছু পুকুর এখন সমতল ভূমি। প্লট আকারে বিক্রিও হচ্ছে।
জনউদ্যোগ সদস্য সাংবাদিক নেতা মিলন রহমান বলেন, ধান আবাদি এলাকা হরিণার বিল যশোরের শস্যভান্ডার। সদরের চাঁচড়া ও রামনগর ইউনিয়ন জুড়ে বিলটির অবস্থান। বিলের ৫০৭ হেক্টরের মধ্যে প্রায় ৪৮৫ হেক্টরই আবাদি জমি। বর্ষা মৌসুমে বিল জুড়ে পানি থৈ থৈ করে। এ সময় বিলে দেশি প্রজাতির মাছ পাওয়া যায় প্রচুর এবং ধানের আবাদও হয়। ধান ছাড়াও বিলের জমিতে সবজি ও ফলের আবাদ হয়। ভরা বিলে স্থানীয় মানুষজন মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। যশোর শহরের বেশিরভাগ এলাকার পানিও নিষ্কাশন হয় এই বিলটিতে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, হরিণার বিলের ভাতুড়িয়া সড়ক, মাহিদিয়া সড়কের বিভিন্ন এলাকা ভরাট করে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলা হচ্ছে। বিদ্যমান আইনের তোয়াক্কা না করে প্রকাশ্যে বিল উজাড় করা হচ্ছে। বিলভরাট, কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তনসহ ভরাটের কাজে মাটি বহনের সময় সড়ক বিনষ্ট করা হলেও কোনো ধরনের ব্যবস্থা নিচ্ছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। আইন ভেঙে বিল ভরাট করে অনেকে আবাসন প্রকল্প গড়ে তোলায় বিলটি দিয়ে পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে গেছে। আবাসন গড়ে তোলায় বিলের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে বছরের বেশিরভাগ সময় বিলটি জলাবদ্ধ থাকছে। এতে যশোর শহরের পানি নিষ্কাশন বাধাপ্রাপ্ত হয়ে পৌর এলাকা বর্ষাকালে তলিয়ে যাচ্ছে। এতে প্রকৃতির বিনাশ ছাড়াও যশোর শহরসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হবে।
জনউদ্যোগ নেতৃবৃন্দ আত্মঘাতি পরিবেশ বিনাশী পুকুর ভরাট ও আবাসন প্রকল্পের কাজ বন্ধের দাবি জানিয়ে বলেন, এই অপতৎপরতা বন্ধে এখনই দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হলে যশোরবাসীকে অন্তহীন দুর্ভোগে পড়তে হবে।
এদিকে, পরিবেশ সংরক্ষণ আইন লংঘন করে পুকুর ভরাটের অভিযোগে চাকরিচ্যুত পুলিশ পরিদর্শক মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের রিসার্স অফিসার সৌমেন মৈত্র বাদী হয়ে গত ৩ জুন আদালতে মামলা করেছেন। চাঁচড়া মৌজার আলমগীর সিদ্দিকীর আরএস ৫০৬৩ দাগের ১৩৫ শতক পুকুরের জমির মধ্য থেকে দশ শতক কেনেন মোয়াজ্জেম হোসেন। পরবর্তীতে তিনি পরিবেশ আইন লংঘন করে পুকুর ভরাট করে ফেলেন।



















